
ছবি সংগৃহীত---
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে, যা পুরো জাতিকে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রতিদিনের সমাজচিত্রে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এটি এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের তালিকায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এক গভীর সামাজিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এই নৃশংসতার নেপথ্যে প্রধানত তিনটি প্রধান অনুঘটক কাজ করছে—
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দীর্ঘসূত্রতা: বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তার অভাব এবং মামলার রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর লেগে যাওয়ার সুযোগ নেয় অপরাধীরা। অপরাধ সংঘটিত করেও পার পেয়ে যাওয়ার এ প্রবণতা অপরাধ প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
নৈতিক স্খলন ও প্রযুক্তির অপব্যবহার: পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটে ক্ষতিকর বা বিকৃত কন্টেন্টের অবাধ বিস্তার মূল্যবোধকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করছে।
তদারকির অভাব ও প্রশাসনিক গাফিলতি: অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের বা তদন্তে শিথিলতা ও সামাজিক জবাবদিহিতার অভাবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংকট নিরসনে চার স্তরের সমন্বিত করণীয়:
বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—এই চার স্তর থেকে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
১. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানকে নিরাপদ রাখতে ভীতিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিশুকাল থেকেই 'গুড টাচ ও ব্যাড টাচ' সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া জরুরি। সেই সাথে সন্তানের ডিজিটাল গতিবিধির ওপর অভিভাবকদের সুস্থ নজরদারি বজায় রাখতে হবে। ২. সামাজিক প্রতিরোধ: ঘটনা চেপে যাওয়ার মানসিকতা বা 'সামাজিক মান-সম্মানের' ভয়ে চুপ না থেকে অপরাধীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। স্থানীয় পর্যায় ও মহল্লায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জীবনদক্ষতা শিক্ষা: ট্যাবু বা সংকোচ দূর করে বয়সোপযোগী যৌন শিক্ষা, সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমানা সম্পর্কে সচেতনতা পাঠ্যক্রম এবং প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ৪. দ্রুত বিচার ও কঠোর আইন প্রয়োগ: শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন ৯০ দিন) বিচার নিষ্পত্তি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও জাতীয় সহায়তামূলক সেবা নম্বরের (যেমন ১০৯৮ বা ৯৯৯) সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ঘটাতে না পারলে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। জাতিকে নিরাপদ করতে এখন প্রয়োজন অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) এবং সর্বস্তরের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।